Page Nav

HIDE

Classic Header

{fbt_classic_header}

NEW :

latest

সাময়িক পত্র সম্পর্কে আলোচনাঃ

  ‘‘ নতুন ঊষার স্বর্ণদ্বার,     খুলিতে বিলম্ব কত আর  ‘’ --- সাময়িক পত্রের আবির্ভাব ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কালপুরুষের কন্ঠ থেকে যেন এই প্রশ্ন ...


 ‘‘ নতুন ঊষার স্বর্ণদ্বার,
    খুলিতে বিলম্ব কত আর  ‘’
--- সাময়িক পত্রের আবির্ভাব ও বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কালপুরুষের কন্ঠ থেকে যেন এই প্রশ্ন অব্যক্তভাবে উচ্চারিত হয় । বাংলা গদ্যকে সাময়িক পত্রগুলি দিয়েছে অবারিত বেগ এবং মনের সকল ভাব প্রকাশের অকুন্ঠ ক্ষমতা । 

(১) ‘বেঙ্গল গেজেট’ ঃ
➤ বেঙ্গল গেজেট ছিল ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা।
➤ এটি ছিলো ভারতের প্রথম প্রধান পত্রিকা যা ১৭৮০ সালের ২৯শে জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে।
➤ এটি দুই বছর পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছিল। 
➤ ১২ ইঞ্চি দীর্ঘ ও ৮ ইঞ্চি প্রস্থ দুই পৃষ্ঠার এ পত্রিকাটির মালিক, সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি।
➤  ২৩শে মার্চ ১৭৮২ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
➤ পত্রিকার গুরুত্ব :
    এই পত্রিকায় পাঠকদের চিঠি প্রকাশিত হতো নিয়মিত। এসব চিঠিতে যেমন থাকত কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী ইউরোপীয়দের নানা অভাব-অভিযোগ ও অসুবিধার কথা, তেমনি থাকত প্রশাসনের দুর্নীতি ও অন্যায়ের খবরও। পত্রিকাটিতে বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদ প্রকাশিত হত ।

(২) ‘দিগদর্শন’ ঃ
➤ ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জনক্লার্ক ও মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ।
➤  শ্রীরামপুর মিশন থেকে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় । 
➤  খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচার করা ছিল এই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
         যুবকেরা যাতে কুপথে যেতে না পারে তার জন্য নানান প্রবন্ধ নিবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত। অর্থাৎ সামাজিক দায়িত্ব পালন ছিল এই পত্রিকার মুখ্য ভূমিকা। তাছাড়া বাংলা গদ্যের সূচনা পর্বে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্য অনেকটাই সচল হয়েছে।


(৩) ‘সমাচার দর্পণ’ ঃ
➤ ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মে জনক্লার্ক ও মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ।
➤ শ্রীরামপুর মিশন থেকে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ।
➤ এটি ছিল শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় পত্রিকা ।
➤ এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা ।
➤ প্রতি শনিবার এই পত্রিকা প্রকাশিত হত ।
➤ প্রথমদিকে এই পত্রিকা বিনামূল্যে প্রকাশিত হত ।
➤ পরে এই পত্রিকার দাম ধার্য করা হয় মাসে দেড়টাকা ।
➤ ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এই পত্রিকার ফরাসি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ।
➤ ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ইংরাজি ও বাংলা ভাষায় এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ।
➤ ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই পত্রিকাটি চালু ছিল ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
        হিন্দু ধর্ম ও কর্মের বিরুদ্ধ আচরণ করে খ্রিষ্ট ধর্মের মহিমা কীর্তনের উদ্দেশ্যে এই পত্রিকা প্রকাশিত হলেও বিভিন্ন ধরণের সংবাদ, শিল্প সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন সম্পর্কিত প্রবন্ধও পত্রিকাতে প্রকাশিত হত। এর গদ্য ভাষা ছিল সহজ এবং সরল।

(৪) ‘বঙ্গাল গেজেটি’ ঃ
➤ গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় বাঙ্গাল গেজেট  প্রকাশিত হয় ।
 ➤ একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। 
➤  “ওরিয়েন্টাল স্টার” পত্রিকার সূত্রে জানা যায় বাঙ্গাল গেজেট ১২২৫ বঙ্গাব্দ বা ১৮১৮ সালের ১৬ মে তারিখে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। 
➤  সামগ্রিক বিবেচনায় বাঙ্গাল গেজেট ছিল বাংলা ভাষায় ও বাঙালি সম্পাদক-প্রকাশকদের পরিচালনায় প্রথম সংবাদপত্র। 
➤ পত্রিকাটি মাত্র এক বছর প্রকাশ হয়েছিল।
➤ এটি ভারতীয়দের সম্পাদনা-প্রকাশনা-পরিচালনায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র।
➤ পত্রিকাটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও উৎসাহদাতা ছিলেন রাজা রামমোহন রায় ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
        বেঙ্গল গেজেট-এ সুন্দর, সংক্ষিপ্ত এবং শুদ্ধ বাংলা ভাষায় বেসামরিক নিয়োগের অনুবাদসমূহ, সরকারি প্রজ্ঞাপন ও নীতিমালা প্রভৃতি এবং পাঠকদের নিকট আকর্ষণীয় এমন অন্যান্য স্থানীয় বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত হতো।

(৫) ‘সম্বাদ কৌমূদী’ ঃ
➤ ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাচাঁদ দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় । 
➤  এই পত্রিকার কর্ণধার ছিলেন রামমোহন রায় । 
➤  বাঙালী’র প্রথম সমাচার পত্র সমাচার দর্পন । 
➤ সমাচার দর্পনে হিন্দুধর্ম ও শাস্ত্রকে যে গালমন্দ করা হত তার জবাব দিতে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ প্রথম দিকে এই পত্রিকা মঙ্গলবারে প্রকাশিত হত । 
➤ ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মার্চের পরম মঙ্গলবারের পরিবর্তে শনিবার থেকে এই পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
            ধর্ম, রাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান, দেশ-বিদেশের নানান সংবাদ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হত। জনসাধারণের কল্যাণ সাধনই ছিল এই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য। "সম্বাদকৌমুদী' ছিল ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র। এর সহজ গদ্যও সেদিনের পাঠককে বিশেষভাবে আকর্ষিত করতো ।

(৬) ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ ঃ
➤ ৮২১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রামমোহন রায়ের উদ্যোগে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤  রামমোহন রায় শিবপ্রসাদ রায় ছদ্মনামে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন ।
➤  শ্রীরামপুরের এক পাদ্রী হিন্দুধর্ম ও দর্শনকে আক্রমণ করে প্রবন্ধ লিখলে রামমোহন তার প্রত্যুত্তর পত্র পাঠালে সেই পত্র ‘সমাচার দর্পনে’র সম্পাদক প্রকাশ করেন নি । এর জবাবে রামমোহন এই পত্রিকা প্রকাশ করেন । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
        খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি বিরুদ্ধ আচরণ এবং হিন্দু ধর্মের নানান বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত। সবরকমের অলৌকিকতার বিরুদ্ধে রামমোহন এই পত্রিকায় নানান প্রবন্ধ লিখেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত গদ্যের সরসতা পাঠকের দৃষ্টি 2 আকর্ষণ করে।


(৭) ‘সমাচার চন্দ্রিকা’ ঃ
➤ ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মার্চ ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এই পত্রিকা  প্রকাশিত হয় ।
➤  রামমোহনের সতীদাহ নিবারনের জবাব দিতে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ ভবানীচরণ মারা গেলে তাঁর পুত্র রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই পত্রিকা প্রকাশ করেন ।
➤ ভবানীচরণ ঋণগ্রস্ত  হয়ে পড়লে ভগবতী  চট্টোপাধ্যায় এই  পত্রিকার স্বত্ত্ব কিনে নেন । কিছুদিন প্রাত্যহিক প্রকাশ করেন।
➤ ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের এই পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় ।   
পত্রিকার গুরুত্ব :
         রামমোহনের মতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধ আচরণ করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হত বলে এটি গোড়া হিন্দুদের মুখপত্র হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি হিন্দুদের কাছে পত্রিকাটি জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছিল। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নানা আচার-আচরণ ও সংস্কার বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। রঙ্গব্যসমূলক রচনাগুলি সমকালে পাঠকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। 

(৮) ‘সংবাদ প্রভাকর’ ঃ
প্রথম পর্যায়ঃ
➤ ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জানুয়ারী ঈশ্বরগুপ্তের সম্পাদনায় সাময়িক পত্র সম্বাদ প্রভাকর প্রকাশিত হয় । 
➤  যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর ছিলেন এই পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক । 
➤  এই পত্রিকার মাথায় লেখা থাকতঃ 
 ‘সত্যং মনস্তামরস প্রভাকরঃ সদৈব সবের্ষু সম প্রভাকরঃ ।
 উদেতি ভাস্বৎ সকলা প্রভাকরঃ সদর্থসম্বাদনবপ্রভাকরঃ ।।
➤  এই পত্রিকার মাসিক মূল্য ছিল ১ তঙ্কা মাত্র । 
➤  ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় ।     
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ
➤ ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে পত্রিকাটি পুনঃ প্রকাশিত হয় । 
➤ প্রথমে পত্রিকাটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল, পরে সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত  হতে থাকে ।
তৃতীয় পর্যায়ঃ
➤ ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুন থেকে পত্রিকাটি দৈনিক প্রকাশিত হতে থাকে । 
➤ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর পর ঈশ্বরগুপ্তের ভাই রামচন্দ্র গুপ্ত কিছুদিন এই  পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ।   
পত্রিকার গুরুত্ব :
            সংবাদ পরিবেশনের যে নিয়ম ও নীতি তার প্রথম প্রকাশ এই পত্রিকার মধ্য দিয়েই। এই পত্রিকার পাতাতেই কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নাটককার দীনবন্ধু মিত্র, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব ঘটেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রঙ্গব্যঙ্গমূলক রচনাগুলি তং কালে পাঠকের কাছে বেশ আদরণীয় হয়ে উঠেছিল।

(৯) ‘জ্ঞানান্বেষণ’ ঃ
➤ ১৮৩১ সালের ৩১ মে দক্ষিণারঞ্জন  মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়  কলকাতার চোরাবাগান থেকে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ এই পত্রিকা ছিল ইয়ংবেঙ্গল দলের মুখপত্র । 
➤ এই পত্রিকার কার্যাধক্ষ্য ছিলেন গৌরিশঙ্কর তর্কবাগীশ । 
➤ দক্ষিণারঞ্জনের পর রামকৃষ্ণ মল্লিক ও মাধবচন্দ্র মল্লিক পত্রিকার কার্যভার গ্রহন করেন ।
➤ এই পত্রিকার শুরুতে মলাটের উপর গৌরিশঙ্কর তর্কবাগীশের লেখা সংস্কৃত ও বাংলা কবিতা মুদ্রিত থাকতোঃ
 ‘‘ এহি জ্ঞান মনুষ্যানামজ্ঞানতিমিরং হর ।
     দয়াসত্যঞ্চ সংস্থাপ্য শঠতামানি সংহব ।।
     বাঞ্ছা হয়ে জ্ঞান তুমি কর আগমণ ।
     দয়া সত্য উভয়কে করিয়া স্থাপন ।।”
➤ ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের পর এই পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায় । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
          ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে পত্রিকার একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বেদ পড়া কিংবা শোনা হিন্দু সমাজের স্ত্রীলোকদের নিষিদ্ধ ছিল। যুক্তি দিয়ে এই পত্রিকায় তার বিরোধীতা করে নানান প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হত। ঊনিশ শতকের বাংলাদেশে প্রগতিশীল চিন্তাধারার বাহন হিসাবে এই পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম।


(১০) ‘তত্ত্ববোধিনী ’ ঃ
➤ ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ আগস্ট দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
➤ তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র ছিল এই পত্রিকা । 
➤ প্রথমে এটি মাসিক পত্রিকা ছিল ।  
➤ এই পত্রিকার সম্পাদকগণঃ
(i) ১৮৪৩ - ১৮৫৫ ---  অক্ষয়কুমার দত্ত । 
(ii) ১৮৫৯ - ১৮৬২ ---  সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ।
(iii) ১৮৬২ - ১৮৬৫ ---  অজ্ঞাত ব্যক্তি । 
(iv ১৮৬৫ - ১৮৬৭  --- অযোধ্যানাথ পাকরাশি ।
(v) ১৮৭২ - ১৮৭৭ ---  সীতানাথ ঘোষ ।
(vi) ১৮৭৭ - ১৮৮৪ ---  হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন ।
(vii) ১৮৮৪ - ১৯০৮  ---  দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
(viii) ১৯০৯ - ১৯১১ ---  সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর । 
(ix) ১৯১১ - ১৯১৫  --- বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
(x) ১৯১৫ - ১৯২৩ ---  সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ক্ষিতিন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
(xi) ১৯২৩ - ১৯৩৭ ---  ক্ষিতিন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
         দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত 'তত্ত্ববোধিনী সভা'-র মুখপত্র হিসাবে 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। অক্ষয় কুমার দত্ত তার নিজস্ব চিন্তাধারার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই পত্রিকার মধ্যে। যেখানে সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হত। বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসে এই পত্রিকা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে।
➤ পত্রিকার লেখকগোষ্ঠী :
             এই পত্রিকার লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় কুমার দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ।

(১১) বেঙ্গল স্পেকটেটর ঃ
➤ ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।।
➤ এই পত্রিকার সম্পাদক : রামগোপাল ঘোষ।
➤ ১৮১৮ সালে লন্ডনে রবার্ট স্টিফেন ‘ইংরেজি স্পেকটেটর' পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। অনুমান করা হয় তারই অনুকরণে নব্যবেঙ্গলের যুবকরা বেঙ্গল স্পেকটেটর' পত্রিকাটি প্রকাশ করতেন। 'বেঙ্গল স্পেকটেটর' মাসিক পত্রিকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

(১২) ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ ঃ
➤ ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ বিলাতি পেনী ম্যাগাজিনের আদর্শে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এটি বাংলা ভাষার প্রথম সচিত্র মাসিক পত্রিকা । 
➤ পত্রিকাটি ব্যাপটিস্ট মিশনের ছাপাখানায় ছাপা হত । 
➤ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় অনিয়মিতভাবে আটটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
➤ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের পর কালিপ্রসন্ন সিংহ এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
          বিলেতী পেনী ম্যাগাজিনের আদর্শে এই পত্রিকার প্রকাশ। মহাপুরুষদের জীবনকাহিনী, পুরাতত্ত্ব, ভ্রমণ কথা, খাদ্য, বাণিজ্য, কাব্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নানান প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হত। এই পত্রিকাতেই প্রথম সাহিত্য সমালোচনা শুরু হয়েছিল। মধুসূদনের 'তিলোত্তমাসম্ভব' কাব্যের প্রথম সর্গ এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় যে ছবি ছাপা হত তার জন্য বিদেশ থেকে আনা ধাতুর তৈরি ব্লকের সাথে এদেশের তৈরি কাঠের ব্লক ব্যবহার করা হত । 


(১৩) ‘সোমপ্রকাশ’ ঃ
➤ দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা ।
➤ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের পর মোহনলাল বিদ্যাবাগীশ সম্পাদনা করেন ।
➤ শেষের দিকে উপেন্দ্রকুমার এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন ।
➤ প্রতি সোমবারে প্রকাশিত হত বলে এই পত্রিকার নাম সোমপ্রকাশ । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
             নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। এই পত্রিকা চরম প্রতিবাদ হানে। দরিদ্র কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করবার জন্য নানান ধরণের প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হত। এছাড়াও সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়েও প্রবন্ধ ও নিবন্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত হত ।
 
(১৪) ‘বঙ্গদর্শন’ ঃ
➤ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে (১২৭৯ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ) এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤ এই পত্রিকার সম্পাদকগণ ঃ
(ক) ১৮৭২ - ১৮৭৬ ---- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । 
(খ) ১৮৭৭ - ১৮৮১ ----  সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
          আধুনিক মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সার্থক প্রকাশ বঙ্গদর্শনের মধ্য দিয়েই। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন -- “বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল।”
            এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে রঙ্কিমচন্দ্র একটি সাহিত্যগোষ্ঠী তৈরী করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের নেতৃত্বে রমেশ চন্দ্র দত্ত, নবীনচন্দ্র সেন, চন্দ্রনাথ বসু, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিকগণ এই পত্রিকায় সাহিত্য সাধনা করেছেন।
➤ পত্রিকায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
       বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ', ‘রাজসিংহ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল', 'দেবী চৌধুরাণী’, ‘কমলাকান্তের দপ্তর ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
‘নবপর্যায় বঙ্গদর্শন’ ঃ
➤ শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর ভাই শৈলেশচন্দ্র মজুমদার পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের চেষ্টা করেন ।
➤ ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন (১৯০১ থেকে ১৯০৪ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন ) ।
➤ এই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাস প্রকাশিত হয় । 


(১৫) ‘ভারতী’ ঃ
➤ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় ১২৮৪ বঙ্গাব্দের (১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের) শ্রাবন মাসে ঠাকুরবাড়ি থেকে ভারতী পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা ।
➤ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকটি প্রকাশের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন । 
➤ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন --‘‘ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সম্পাদক না হলেও প্রকৃতপক্ষে ভারতী জ্যোতিবাবুরই মানস কন্যা” । 
➤ এই পত্রিকার সম্পাদকগণঃ
(i) ১২৮৪ - ১২৯০ ----  দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর । 
(ii) ১২৯১ - ১৩০১ ----  স্বর্ণকুমারী দেবী ।
(iii) ১৩০২ - ১৩০৪  ----  হিরন্ময়ী দেবী ও সরলা দেবী। 
(iv) ১৩০৫   ---- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
 (v) ১৩০৬ - ১৩১৪ ----  সরলা দেবী ।
 (vi) ১৩১৫ - ১৩২১ ----  স্বর্ণকুমারী দেবী।
 (vii) ১৩২২২ - ১৩৩০ ----  মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরিমোহন  মুখোপাধ্যায় ।
(viii) ১৩৩১ - ১৩৩৩ ---- সরলা দেবী ।  
পত্রিকার গুরুত্ব :
         'ভারতী' পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার ফলে রবীন্দ্রপ্রতিভা সাহিত্যের সমস্ত শাখায় অনায়াস বিচরণের যোগ্য পরিবেশ খুঁজে পেয়েছিল। এই পত্রিকায় 'মেঘনাদবধ কাব্য' - এর সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শ্রেষ্ঠ গদ্য শিল্পীর আত্মপ্রকাশও এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে।

(১৬) ‘সাধনা’ ঃ
➤ সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় ১২৯৮ বঙ্গাব্দের (১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের) অগ্রায়ন মাসে সাধনা পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤ এই পত্রিকার সম্পাদকগণঃ
(i) ১২৯৮ - ১৩০১ ---- সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর । 
(ii) ১৩০২ ---- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
          রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য জীবনে এই পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম। সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, সঙ্গীত ইত্যাদি নানান বিষয়ে এই পত্রিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রবীন্দ্রনাথের 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন', 'য়ুরোপমাত্রীর ডায়েরী প্রভৃতি রচন৷ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

(১৭) ‘প্রবাসী ’ ঃ
➤ ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রবাসী পত্রিকা প্রকাশিত  হয় ।
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤ এটি ছিল বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা । 
➤ রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসটি এখানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
           বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে সবচেয়ে  উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হল 'প্রবাসী'। রাজনীতি, সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রভাস্কর্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এই পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হত।। রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা' উপন্যাস এই পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বহু লেখা এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে।

(১৮) ‘ভারতবর্ষ’ ঃ
➤ ১৩২০ বঙ্গাব্দের (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের)  আষাঢ়  মাসে  দ্বিজেন্দ্রলাল  রায়ের সম্পাদনায় ভারতবর্ষ পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤  এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤  এটি ছিল সচিত্র পত্রিকা ।
➤  এই পত্রিকার ভূমিকা অংশ লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় । 
➤  পত্রিকা প্রকাশের তিন মাস পর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মারা যান । 
➤  প্রধানত জলধর সেন ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক । 
➤  অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ ছিলেন এই পত্রিকার সহ - সম্পাদক ।
➤  গুরুদাস অ্যান্ড সন্স এর পুস্তক প্রকাশন থেকে এই পত্রিকা পুকাশিত হয় ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
          এই পত্রিকায় নানান গুণী সাহিত্যিকের লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, রবীন্দ্রনাথ | ঠাকুর, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জলধর সেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস', 'দত্তা', 'দেনাপাওনা' প্রভৃতি উপন্যাস এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।


(১৯) ‘যমুনা’ ঃ
➤ ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ধীরেন্দ্রনাথ পালের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শরৎচন্দ্রের আবির্ভাব হয় ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
           শরৎচন্দ্রের বিভিন্ন রচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ছোটগল্প 'রামের সুমতি' উপন্যাস 'নিষ্কৃতি' ও 'পরিণীতা'।

(২০) ‘সবুজপত্র’ ঃ
প্রথম পর্যায়ঃ
➤ ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের (১৩২১ বঙ্গাব্দের) ২৫শে বৈশাখ প্রমথ চৌধুরীর  সম্পাদনায় সবুজপত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤ প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম ছিল ‘বীরবল’ । 
➤ ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায় ।  
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ
➤ ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ (১৩৩২ - ১৩৩৫) পর্যন্ত  এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ প্রথম পর্যায়ের প্রায় নয় বছর, পরে দুই বছর - মোট এগারো বছর এই  পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল ।  
পত্রিকার গুরুত্ব :
          ‘সবুজ পত্র' পত্রিকাটি প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত সাধু ভাষাই ছিল মূলতঃ বাংলা সাহিত্যের বাহন। 'সবুজপত্র'-ই প্রথম চলিত ভাষার উপর গুরুত্বদান করে। 'সবুজ পত্র' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে 'বীরবলী চক্র গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের 'বলাকা' কাব্যের সবুজের অভিযান' কবিতা, 'ঘরে বাইরে উপন্যাস ' ‘ফাল্গুনী’ নাটক প্রভৃতি এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। এককথায় 'সবুজপত্র' বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সূচনা করেছিল। এই পত্রিকার কয়েকজন উল্লেখযোগ্য লেখক হলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, পূজটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ।

(২১) ‘নারায়ণ’ ঃ
➤ ১৩২১  বঙ্গাব্দে  (১৯১৪ সালে)  চিত্তরঞ্জন  দাশের  সম্পাদনায়  এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤ এটি ছিল মাসিক পত্রিকা । 
➤ ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে এই পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় । 
➤ সবুজপত্র পত্রিকার সাথে এই পত্রিকার বিরোধ ছিল । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
          ‘সবুজপত্র' পত্রিকার সঙ্গে এই পত্রিকার ঘোর বিরোধ ছিল। এই পত্রিকার লেখকদের মধ্যে অন্যতম হলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র যুগাভাবে এই পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন।

(২২) ‘কল্লোল’ ঃ
➤ ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১৩৩০ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ) গোকুলচন্দ্র নাগ ও দীনেশরঞ্জন দাসের পরিচালনায় ‘কল্লোল’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন দীনেশরঞ্জন দাস ।
➤ পত্রিকাটির সহ - সম্পাদক ছিলেন গোকুলচন্দ্র নাগ ।
➤ পত্রিকাটি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ ( ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত প্রকাশিত হয় ।
পত্রিকার গুরুত্ব :
          প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে যুবক সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা ও যন্ত্রণার যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল তারই যোগ্য প্রকাশ হিসাবে 'কল্লোল' পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। 'কল্লোল' লেখকগোষ্ঠীরা রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে সরে এসেছিলেন। ডঃ সুকুমার সেন এই পত্রিকার লেখকবর্গ সম্পর্কে বলেছেনঃ
“স্পষ্ট, রবীন্দ্রবিদ্বেষ না থাকিলেও রবীন্দ্র বিমুখতা ছিল। অনেকেরই।"
--- বিদ্রোহ, প্রতিবাদ, অবদমিত কামনা, বাসনা, যৌনক্ষুধা এই পত্রিকার সাহিত্যচর্চার মুখ্য বিষয় ছিল। বাংলা সাহিত্যে নবীনতা এবং প্রগতির যোগ্য দিশারী 'কল্লোল'।


(২৩) ‘শনিবারের চিঠি’ ঃ
প্রথম পর্যায়ঃ
➤ সজনীকান্ত  দাসের  পরিচালনায় ও যোগানন্দ দাসের  সম্পাদনায়  ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই (১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১০ শ্রাবণ) শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হয় । 
➤ পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন যোগানন্দ দাস । 
➤ এটি ছিল সাপ্তাহিক সাহিত্য পত্রিকা । 
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ
➤ ১৩৩৪  বঙ্গাব্দের ৯ ভাদ্র থেকে  শনিবারের  চিঠি  নবপর্যায়ে মাসিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হয় ।
➤ এই সময় পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী ।
➤ পত্রিকার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন সজনীকান্ত দাস । 
➤ তাত্ত্বিক গুরু ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার । 
তৃতীয় পর্যায়ঃ
➤ ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যার পর থেকে শনিবারের চিঠি তৃতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত হতে থাকে ।  
➤ এই সময় পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন সজনীকান্ত দাস ।
➤ মাসিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হয় ।  
পত্রিকার গুরুত্ব :
         বিরোধীতাই ছিল এই পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য। তরুণ সাহিত্যিকদের সাহিত্যকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করাই ছিল 'শনিবারের চিঠি'-র মুখ্য কর্ম। এই পত্রিকার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে অন্যতম হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বলাইচান মুখোপাধ্যায় (বনফুল)

(২৪) ‘পরিচয়’ ঃ
➤ ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে (১৩৩৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবন মাসে) সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায় পরিচয় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। 
➤ এটি ছিল ত্রৈমাসিক পত্রিকা । 
➤ ১৯৩১ - ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। 
➤ পরে হিরণকুমার সান্ন্যাল, গোপাল হালদার, সুভাষ মুখোপাথ্যায়, মঙ্গলাচরন চট্টোপাধ্যায় , মনীন্দ্র রায় আরো অনেকে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
           সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার উপর এই পত্রিকা বিশেষ গুরুত্ব দান করে। বাংলা রচনার তরলতা বা তারল্যতাকে বর্জন করে তারমধ্যে গভীরতা আনবার সযত্ন প্রয়াস এই পত্রিকার মূল উদ্দেশ্য ছিল। মার্কসীয় সাহিত্যের বিকাশ এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই ত্বরান্বিত হয়েছে।
 পত্রিকার লেখকগোষ্ঠী ঃ
        এই পত্রিকার উল্লেখযোগ্য লেখক নীরেন্দ্রনাথ রায়, বুদ্ধদেব বসু সমর সেন, সমরেশ বসু প্রমুখ। যামিনী রায়ের প্রচ্ছদ' পরিচয়' -কেসমৃদ্ধ করেছে।
    

(২৫) ‘প্রগতি’ ঃ
➤ অজিত দত্তের সম্পাদনায় ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রগতি পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের আষাঢ় ঢাকা থেকে বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্তের যুগ্ম সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় । 
পত্রিকার গুরুত্ব :
          ‘কল্লোল' এবং 'কালিকলম' পত্রিকার যে আদর্শ ছিল 'প্রগতি' পত্রিকায়ও সেই আদর্শের ব্যতিক্রম হয়নি। মূলতঃ কবিতা পত্রিকা হিসাবে এর আত্মপ্রকাশ। জীবনানন্দ দাশ, অজিত দত্ত, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ কবির কবিতা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ।

(২৬) ‘কালিকলম’ ঃ
➤ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (১৯২৬ সালে) এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
➤  প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় । 
 পত্রিকার গুরুত্ব :
          'কল্লোল' পত্রিকার যে উদ্দেশ্য ও আদর্শ ছিল কালিকলম' তার থেকে কোনো ভিন্ন পথে চলেনি। মুখ্যতঃ 'কল্লোল' গোষ্ঠীর লেখকরাই এই পত্রিকায় লিখতেন। আসলে 'কল্লোল' এবং 'কালিকলম' একই মুক্ত বিহঙ্গের দীপ্ত শাখা।

(২৭) ‘কবিতা’ ঃ
➤ ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় কবিতা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ এই পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন সমর সেন ।
➤ এটি ছিল কবিতা ও কবিতা বিষায়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ।
পত্রিকার গুরুত্ব 
         'কল্লোল’, ‘কালি-কলমে’র মতোই কবিতা'ও নতুন পথ এবং নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এই গোষ্ঠীর লেখকদের মূল কথাই ছিল, রবীন্দ্রনাথ প্রদর্শিত রোমান্টিক ভাবাবেগ জড়িয়ে থাকলে চলবে না, সাহিত্যের আঙিনায় পত্তন করতে হবে নতুন কালের। বুদ্ধদেব, প্রেমেন্দ্র, সমর, জীবনানন্দ প্রমুখ কবিরা এই পত্রিকায় লিখতেন।

(২৮) ‘দেশ’ ঃ
➤ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সম্পাদনায় ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘দেশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ পত্রিকার কর্নধার ছিলেন প্রফুল্লকুমার সরকার ।
➤ এই পত্রিকার নতুন সম্পাদক হন বঙ্কিমচন্দ্র সেন ।
পত্রিকার গুরুত্ব 
    ‘দেশ’ এখনও বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীদের সেরা সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে বিবেচিত হয়। এটি প্রায়শই "বাংলার নিউ ইয়র্কার" হিসাবে উল্লেখ করা হয় । বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক এবং প্রবীণদের প্রায় সকলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সত্যজিৎ রায়, মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রচনায় কখনও কখনও বা অন্য লেখা রয়েছে। ভারতের প্রাচীনতম এবং ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম এই পত্রিকাটি বর্তমানে অষ্টাদশ বছরে পা দিয়েছে।


(২৯) ‘বঙ্গবাসী’ ঃ
➤ ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর সম্পদনায় ৪১নং চাঁপাতলা ফাস্ট লেন থেকে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ অক্ষয়চন্দ্র সরকারের ‘সাধারনী’ নামে পত্রিকার দ্বারা অনুপ্রানীত হয়ে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ এই পত্রিকার সহ সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু ।
➤ যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর সহযোগী ছিলেন উপেন্দ্রনাথ সিংহ রায় ।    
পত্রিকার গুরুত্ব 
         প্রথম সংখ্যা থেকেই পত্রিকাটি বাঙালির মন আকর্ষণ করে নিয়েছিল। ক্রমে বাংলার জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকায় পরিণত হয়েছিল ‘বঙ্গবাসী'। সেই সময়ের বাংলার সেরা লেখকেরা এই পত্রিকায় লিখেছেন। বঙ্গবাসী রাজদ্রোহের অপরাধে অপরাধী হয়েছিল। 'মনিপুর বিদ্রোহ' এবং 'consent act' যা বঙ্গবাসীতে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশময় ঝড় উঠেছিল। ‘বঙ্গবাসী’র দ্বারা উদ্দীপিত বালগঙ্গাধর তিলক 'কেশরী' পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। বঙ্গবাসীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকা ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ‘হিতবন্দি' পত্রিকা, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ‘বসুমতী' পত্রিকার আবির্ভাব ঘটে। 

(৩০) ‘কৃত্তিবাস’ ঃ
➤ ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার ও আনন্দ বাগচীর সম্পাদনায় কৃত্তিবাস পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।
➤ ১৯ বছর বয়সে কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাাধ্যায়।
➤ এটি ছিল সাহিত্য কবিতা পত্রিকা । পরবর্তীকালে এতে গল্পও প্রকাশিত হয়।
➤ শেষের দিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একা এই পত্রিকার সম্পাদক হন ।    
পত্রিকার গুরুত্ব 
        কৃত্তিবাস তার জন্মলগ্ন থেকে শুধু তো একটি পত্রিকা নয়, একটি সাহিত্য আন্দোলন। বাংলা সাহিত্যের মোড় ফেরার একটি বিশেষ যুগ লক্ষণ । প্রবীণতম কবি থেকে নবীনতম কবি পর্যন্ত লিখেছেন এ বইটিতে, ফলে কবিতা বা সাহিত্যচর্চার নিয়ত পরিবর্তনে ক্রমাগত চিহ্নিত হতে থাকে কৃত্তিবাস পত্রিকা ।

No comments